রাইয়ান বিন আমিন, সাভার
দেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও নেতৃত্বের আসনে এখনো পুরুষদের আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়। সমাজবিজ্ঞানী ও মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে দ্বিধাগ্রস্ত হন নানা সামাজিক, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেতৃত্বকে এখনো অনেক ক্ষেত্রে পুরুষকেন্দ্রিক হিসেবে দেখা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে নারীর সিদ্ধান্তকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। পাশাপাশি পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক চাপের কারণে নারীরা নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় পেছনে পড়ে যান। এর সঙ্গে আত্মবিশ্বাস ও আগ্রহের ঘাটতি ও নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক পরিবেশ না থাকাও বড় একটি কারণ।
এর বাস্তব চিত্র দেখা গেল সাভারের রাজাশন এলাকায়। এখানকারই একটি গার্মেন্টেসে কাজ করেন রাহনুমা। বাড়ি লালমনিরহাট। এক বছর ধরে তিনি কাজ করলেও প্রতিদিনের রুটিনের বাইরের খুব একটা চিন্তা করতে পারেন না। ভোরে ঘুম থেকে উঠে পরিবারের সবার জন্য খাবার তৈরি করে আবার রাতে এসেও করতে হয় একই কাজ। পাশাপাশি সংসারের সার্বিক খবরও তাকেই রাখতে হয়।
তার মতে, বড় পদে কাজের চাপ বেশি। নির্ধারিত সময়ের বাইরেও অনেকসময় কাজ করতে হয়। তখন পরিবারকে সময় দেয়া যায় না। পরিবারে কোন কাজ করা যায় না। কিন্তু সে তুলনায় বেতন কম। ফলে অধিকাংশ নারী আগ্রহী হন না।
পাশের ঘরে বসবাস করা হালিমার কিছুটা সুযোগ থাকলেও পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকায় তিনি প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে পারছেন না বা নেতৃত্বে আসতে পারছেন না। তিনি জানান, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। এরপর অভাবের কারণে আর পড়তে পারেননি। এখন পরিবার ছেড়ে এসে সাভারে গার্মেন্টেসে কাজ করেন। কিন্তু পড়াশোনা না জানার কারণে তিনি টেকনিক্যাল কাজগুলো ভালোভাবে শিখতে পারছেন না। এ কারণে পদোন্নতি পাচ্ছেন না।
হালিমা বলেন, সাত বছর ধরে অপারেটর পদে কাজ করছেন। কিন্তু পদোন্নতি হয়নি। কিন্তু তার পরে কাজে যোগদিয়ে অনেক পুরুষ সহকর্মী সুপারভাইজার হয়ে গেছেন।
নারীদের জন্য সরকার ও গার্মেন্টস মালিকপক্ষ থেকেও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণে মনোযোগ কম দেয়া হয় বলেও অভিযোগ তার।
নারী অধিকারকর্মী রুবিনা আক্তার বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে এখনও বৈষম্য আছে। নারী কর্মীদের পদোন্নতিতে বাধা আসে এবং নেতৃত্বের আসনে পৌঁছাতে গেলে তাদের দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়।’
এ অবস্থায় সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয় সামনে আনছেন। এর মধ্যে রয়েছে—কর্মক্ষেত্রে সমঅধিকার নিশ্চিত করা, পদোন্নতির নীতিতে স্বচ্ছতা আনা, নারী কর্মীদের জন্য নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ চালু করা এবং সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা, নেতৃত্বের দক্ষতা অর্জনের জন্য নারী কর্মীদের আলাদা প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপ কর্মসূচি চালু করা। এছাড়া, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, ফ্লেক্সিবল সময়সূচি ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করলে নারীরা নেতৃত্বে আসতে আগ্রহী হবেন বলেও মনে করছেন সবাই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধার মতে, নেতৃত্বে নারীদের অংশগ্রহণ কেবল সমঅধিকারের প্রতিফলন নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের সৃজনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। সমাজ ও প্রতিষ্ঠান যদি একসঙ্গে কাজ করে, তবে কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি বাড়বে এবং আগামী প্রজন্মের কাছে এটি স্বাভাবিক একটি চিত্র হয়ে উঠবে।

























