জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক আশীষ কুমার দত্তের বিরুদ্ধে ওঠা ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি, বরং “সমঝোতা”র মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করছে—যা নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে শিক্ষার্থীরা।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, প্রাণীবিদ্যা বিভাগের ৪৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী রবিনকে ‘ডি গ্রেড’ (সিজিপিএ ২.০০) প্রদান করেন শিক্ষক আশীষ কুমার দত্ত। শিক্ষার্থীটি পক্ষপাতমূলক মূল্যায়নের অভিযোগ তুললে বিশ্ববিদ্যালয় কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুর রবের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওই কোর্সের খাতা নতুনভাবে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের কাছে পাঠানোর পর রবিনের সিজিপিএ ২.০০ থেকে বেড়ে ৩.২৫ হয়। একইসঙ্গে তার চূড়ান্ত বর্ষের সিজিপিএ ৩.৬৮ থেকে ৩.৭৪ এ উন্নীত হয়। অর্থাৎ ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়।
তবুও অভিযুক্ত শিক্ষক আশীষ কুমার দত্তের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে বরং ‘কাউন্সেলিং’-এর পরামর্শ দিয়েছে। প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুনসুরুল হক হোসেন বলেন,“তদন্ত কমিটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসার পরামর্শ দিয়েছে। আমরা একাডেমিক মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আশীষ কুমার দত্তকে কাউন্সেলিং করানো হবে যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।”
তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কেবল কাউন্সেলিং-এর সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বলছেন, এটি প্রশাসনের সরাসরি ব্যর্থতা।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)-এর সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম ফেসবুকে লিখেন,“ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও প্রতিহিংসার রাজনীতির বলি কখনোই হতে পারে না শিক্ষার্থীরা।
প্রাণীবিদ্যা বিভাগের রবিন ও ইউআরপি বিভাগের সাজিদের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, শিক্ষক রাজনীতি ও ব্যক্তিগত আক্রোশ এখন একাডেমিক স্বচ্ছতার বড় অন্তরায়।
এই অরাজকতা দূরীকরণে অবিলম্বে শিক্ষক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু, খাতা পুনর্মূল্যায়ন ও মানোন্নয়ন পরীক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে বহিষ্কারের ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা কোনোদিন বঞ্চনা, শোষণ ও আক্রোশ মেটানোর জায়গা হতে দেব না।”
বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন,
“শাস্তি না দিলে ভবিষ্যতে শিক্ষকরা আরও উৎসাহিত হবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা ভয় বা টিকে থাকার তাগিদে এসব অন্যায় সহ্য করছে।”
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাবি সংসদের সাধারণ সম্পাদক তানজিম আহমেদ বলেন,“শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত মনোভাবের কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে কম গ্রেড দেওয়ার অভিযোগ বহুবার উঠেছে। কিন্তু বিচার না হওয়ায় এমন প্রবণতা বাড়ছে। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগেও অধ্যাপক আফসান হকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগে তদন্ত হলেও তা এখনো ঝুলে আছে।”
প্রাণীবিদ্যা বিভাগের এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“আমরা পরিশ্রম করে পড়ি, তবুও ন্যায্য গ্রেড পাই না। প্রশাসনের উদাসীনতায় এমন ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।”
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপগুলোতে শিক্ষার্থীরা মন্তব্য করেছেন, “যদি রেজাল্ট টেম্পারিং প্রমাণিত হয়েও কোনো শাস্তি না হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা কোথায় ন্যায়বিচার পাবে?”
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এটি জাবিতে প্রথম নয়—পূর্বেও একাধিক বিভাগে ফলাফল জালিয়াতি বা পক্ষপাতমূলক মূল্যায়নের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই “অভ্যন্তরীণ সমঝোতা”র মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়।
অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও যদি আশীষ কুমার দত্তের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—
এটি কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি?























