রাইয়ান বিন আমিন, সাভার
ভোর পাঁচটায় ঘুম ভাঙে লাভলী খাতুনের। তখন আকাশে আলো ফুটে না। রান্না শেষ করে ছোট ছেলে নাফিসকে ডেকে তোলেন মাদরাসায় যাওয়ার জন্য। নিজে কারখানায় যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হতে ছেলেকেও তৈরি করেন।
লাভলী একজন গার্মেন্টস শ্রমিক। সাভারের চাপাইন এলাকার ভিশন গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করেন। মাসে আয় হয় মাত্র সাড়ে ১২ হাজার টাকা। স্বামী মাঝে মাঝে অটোরিকশা চালান, মাঝে মাঝে বসে থাকেন। তাই সংসার, ছেলেদের পড়াশোনার অধিকাংশ সামলাতে হয় লাভলীকেই। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কষ্ট ছেলেদের পড়াশোনা নিয়ে।
তিনি বলেন, ‘আমার দুই পোলাই ভালোই। বড়টা ক্লাস নাইনে পড়ে। কিন্তু অনেক পড়া বুঝে না। অনেকেই স্কুলের স্যারেগো কাছে প্রাইভেট পরে। কিন্তু আমি তো প্রাইভেট দিতে পারি না। টাকা নাই। ওরে প্রাইভেট দিলে বাসার ভাড়া দিতে পারুম না। আবার বাড়িত টাকা পাঠান লাগে। এরলাইগা ছোটডারে মাদরাসায় দিছি। ক্লাস টুতে পড়ে। খরচ কম।’
নাফিসার বয়স ৮। মায়ের স্বপ্ন, ছেলেরা পড়াশোনা করে ভালো চাকরি করবে। কিন্তু পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে যখন হিমশিম খেতে হয় লাভলীকে তখন মনে হয়, ছেলের পড়া বন্ধ করে গ্রামে পাঠিয়ে দিবে অথবা কোন গার্মেন্টেসে কাজে দিয়ে দিবে। আক্ষেপ নিয়ে লাভলী বলেন, ‘কেউ চায় না পোলারা কষ্ট করুক। কিন্তু এতো টাকা পামু কই যে লেখাপড়া করামু। তারপরও নিজে খাইয়া না খাইয়া করতাছি। একটা প্রাইভেটের ব্যবস্থা করা পারলে বড় পোলাডা আমার পড়া শেষ কইরা বড় চাকরি করা পারতো।’
সাভার পৌরসভার উলাইল এলাকায় থাকেন রাজীব। কাজ করেন জে.কে গ্রুপে। গত বছরের মার্চ মাসে তার বাবা আব্দুল কুদ্দুস এক দুর্ঘটনায় পা হারান। এরপর চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যান গ্রামের বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জে। এরপরই পরিবারের হাল ধরতে একাদশ শ্রেণি থেকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে রাজীব চলে আসেন সাভারে। বর্তমানে হেলপার হিসেবে কাজ করছেন তিনি।
রাজীব বলেন, ‘ইচ্ছা আছিল ভার্সিটিতে পড়ুম। কিন্তু কপালে নাই। ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা ডিউটি করি। চাইলেও পড়তে পারি না। ওভারটাইম না করলে বাড়িতে টাকা পাঠাইতে পারি না।’
এসময় সরকারি উদ্যোগে সাপ্তাহিক বা নৈশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর দাবি জানান তিনি। বলেন, ‘আমরা যাতে পড়াশোনা চালাইতে পারি এইরকম ব্যবস্থা সরকার থেকে করা দরকার।’
সাভার-আশুলিয়ার মতো পোশাক শিল্প এলাকায় এমন হাজারো আমেনা, আছিয়া ও রাজীবের গল্প ছড়িয়ে আছে। তারা কেউ পড়ালেখা শুরু করেছিল স্বপ্ন নিয়ে, কেউ থেমে গেছে অভাবের চাপে, কেউ এখনও টিকে আছে আশার শেষ সুতায়।
সাভার উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, উপজেলায় ১২১টি সরকারি স্কুল রয়েছে। আর বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাজারের উপরে। তবে, পোশাক শ্রমিক ও তাদের সন্তানদের কথা চিন্তা করে কোন বিশেষ ব্যবস্থা নেই বলেই জানালেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘সামনে হবে এমন কোন উদ্যোগ নেই। সরকারের পক্ষ থেকে পোশাক শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য কোন বৃত্তিও নেই। ফলে বেসরকারি যেসব স্কুল ও কলেজ রয়েছে তা অনেক ব্যববহুল। এজন্য অধিকাংশ পরিবারের সন্তানরা কোনরকমে স্কুল শেষ করলেও আর কলেজ পর্যায়ে যেতে পারে না।’
গার্মেন্টস শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য স্কুলের পাশাপাশি বৈকালিক পাঠদান, বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ এবং মায়েদের জন্য কাজের সময়ের বাইরে সন্তানদের দেখভালের ব্যবস্থার দাবি আমরা বারবার জানিয়ে আসলেও সরকার সাড়া দিচ্ছে না বলে জানান বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি কিছু সংস্থা শ্রমিক শিশুদের জন্য বিকল্প শিক্ষা কেন্দ্র চালু করেছে। তবে সেটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। সরকার এগিয়ে না আসলে পরিবর্তন হবে না।’

























