মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প একসময় ছিল স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র। সেখানে প্রায় প্রতিদিনই ‘খই-মুড়ির’ মতো ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটত। কিন্তু সাম্প্রতিক অনুসন্ধান বলছে, সেই হাতবোমা বা ককটেল এখন আর কেবল ক্যাম্পের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এসব প্রাণঘাতী বোমা রাজনৈতিক সহিংসতায়ও ব্যবহার হচ্ছে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র ও তদন্তে জানা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক অন্তত ২২ জন বোমা কারিগর সক্রিয়ভাবে এসব ককটেল তৈরি করছে। তারা ক্যাম্পের ভেতরেই নয়, বরং চাহিদা অনুযায়ী রাজধানীর বিভিন্ন অস্থায়ী আস্তানায় গিয়েও বিস্ফোরক সরবরাহ করছে। চাহিদা বাড়ায় ককটেলের দামও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা জানান, আগের মতো ভয় দেখানোর জন্য নয়—এখনকার ককটেলে যোগ হচ্ছে সাইকেলের বল, তারকাঁটা ও কাচের টুকরোর মতো প্রাণঘাতী স্প্লিন্টার। এসব উপাদান সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে আসছে, আবার পুরান ঢাকার মিটফোর্ডের খোলা বাজারেও এসব রাসায়নিক বিক্রি হচ্ছে বলে সন্দেহ করছে কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সহকারী কমিশনার মো. মাহমুদুজ্জামান বলেন, “ককটেলের মূল উপাদান পটাশিয়াম ক্লোরেট ও সালফার সাধারণত চোরাই পথে আসে। সাম্প্রতিক ঘটনার পর এসব নিয়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।”গত এক সপ্তাহেই রাজধানীর অন্তত ২০টি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। টার্গেট করা হয়েছে পুলিশ, ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ ভবন। এসব ঘটনায় ১৭টি মামলা হয়েছে এবং বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ছাত্র সংগঠনের কর্মী ও ছিন্নমূল শিশুরাও রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পের সাত নম্বর সেক্টরের এ-ওয়ান মোড়ে বুনিয়া সোহেল গ্রুপের একটি বড় ককটেল কারখানা রয়েছে। এখানে কালু ও দাগী রুবেল নামে দুই কারিগরের নেতৃত্বে ১০ জনেরও বেশি সহযোগী নিয়মিত বোমা তৈরি করছে। এ গ্রুপের সদস্যরা ধানমন্ডি, ইবনে সিনা ও মোহাম্মদপুরে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণেও জড়িত বলে ধারণা করছে পুলিশ।ডিএমপি কর্মকর্তারা বলছেন, আগের ককটেল যেখানে কেবল শব্দ সৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত হতো, এখনকার ককটেলে প্রাণঘাতী স্প্লিন্টার যুক্ত হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বেড়েছে কয়েকগুণ।এরই মধ্যে তেজগাঁওয়ের এক গির্জায় ককটেল হামলার ঘটনায় নীলফামারীর ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল হাকিমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ককটেল ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম। এছাড়া ফার্মগেটের রাজাবাজারে ধরা পড়েছে পিরোজপুর জেলা ছাত্রলীগের কর্মী আরিফুল ইসলাম হৃদয়।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক এই বোমা নেটওয়ার্কই রাজধানীর সাম্প্রতিক সহিংসতার পেছনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

























