রাইয়ান বিন আমিন, সাভার
শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি—সবখানেই নারীরা সমান তালে কাজ করছেন। কিন্তু পরিবারের ভেতরে যখন দায়িত্ব বণ্টনের কথা আসে, তখনও ঘরের কাজকে অনেক পরিবারে শুধুই নারীর কর্তব্য হিসেবে দেখা হয়। রান্না, কাপড় ধোয়া, সন্তান লালন-পালন কিংবা বয়স্কদের দেখাশোনা—সব কিছুর ভার যেন এককভাবে নারীর কাঁধেই। আর নারীদের একটা বড় অংশ যেন এটাকেই বিশ্বাস করে জীবন পার করে দিচ্ছে।
সাভারের দেওগাঁও এলাকার মৌসুমী খাতুনের কথাই বলা যাক। গার্মেন্টেসে কাজের জন্য এক বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসেছেন। চাকরি নিয়েছেন ভিশন গার্মেন্টেসে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে রান্নাসহ বাড়ির যাবতীয় কাজ করে গার্মেন্টেসে যান। সন্ধ্যার পর ফিরে আবারও রান্নার কাজ তাকেই করতে হয়। যদিও কাছাকাছি সময়ে ফিরে তার স্বামী চলে যান বাইরে চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে বা বাসায় বিশ্রাম করেন। বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন তিনি।
মৌসুমী বলেন, ‘ছোট বেলা থেকে এটাই দেখতেছি। বাড়িতে মা সব কাজ করে, আমার শাশুড়ি কাজ করে, আমিও করি। আর পুরুষরা তো বাইরে বাইরে থাকে, গল্প করে। এটাই স্বাভাবিক। তারা তো রান্না করতে পারে না। বাড়ির অন্য কাজও ভালো পারে না। তাই যতো রাতই হোক আমারই সব করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘কোনদিন সন্ধ্যায় গার্মেন্টস ছুটি হয়, তখন একটু ভালো হয়। তাড়াতাড়ি রান্না করতে পারি, ঘরের অন্য কাজ শেষ করে ঘুমাইতে যাইতে পারি। কিন্তু যেদিন ১০টায় ছুটি হয় ওইদিন খুব চাপ পড়ে। তারপরও আমারেই সব করতে হয়। আমার স্বামী আগে বাড়িতে আসলেও সে কোন কাজ করে না। যদি করতো তাহলে তো ভালোই হইত।’ যদিও কাজের বিষয়ে স্বামীকে কোনদিন কিছু বলেননি বলেও জানান মৌসুমী।
একই এলাকার রাজমিস্ত্রী মো. সিরাজ। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও ছেলের স্ত্রীকে নিয়ে তার বসবাস দেওগাঁও এলাকায়। তার ছেলে ও ছেলের স্ত্রী দুজনই কাজ করে। কিন্তু দিনশেষে শাশুড়ির সাথে বাড়ির কাজে হাত দিতে হয় ছেলের স্ত্রী শান্তাকে।
সিরাজ বলেন, বাড়ির রান্নাসহ সব কাজ ছেলের মা অথবা ছেলের স্ত্রী শান্তা করে। কখনো ছেলের মা রান্না করে রাখে। কখনো শান্তা আসলে দুইজনে মিলে করে। বাড়ির কাজও একইরকমভাবে করে। কিন্তু বাড়ির পুরুষরা খুব একটা সহযোগিতা করে না এইসব কাজে। তবে, যদি কখনো দরকার হয় তখন সহযোগিতার কথা জানান সিরাজ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, নারীরা প্রতিদিন গড়ে ৬–৮ ঘণ্টা বিনা পারিশ্রমিকে ঘরের কাজ করেন। অন্যদিকে পুরুষদের গড় সময় মাত্র ৪০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা।
যদিও বর্তমান প্রজন্মে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। নতুন প্রজন্মের তরুণ দম্পতিরা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছেন। কেউ রান্না করছেন, কেউ আবার সন্তানকে পড়াচ্ছেন। শহরের চাকরিজীবী দম্পতিদের মধ্যে অনেকেই এখন কাজ ভাগাভাগি করে নেন।
এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম ব্যাংক) সাভার শাখায় কর্মরত সানজিদা ইসলাম নামের ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার স্বামী নিয়মিত রান্নাঘরে সাহায্য করে। আমি অফিস থেকে দেরি করে ফিরলে সে-ই রান্না করে রাখে। এতে সংসার চালাতে আমাদের কারও আলাদা চাপ পড়ে না।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। তবে বড় পরিসরে এই বিভেদ এখনও কাটেনি। এজন্য মানসিকতার পরিবর্তনের পাশাপাশি সচেতনতার উপর জোর দিচ্ছেন এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়ানো হয় মা রান্না করে, বাড়ির কাজ করে। আর বাবা চাকরি করে বা ব্যবসা করে। আবার এসব দেখেই আমরা অভ্যস্ত। ফলে দ্রুতই পরিবর্তন আসবে না। কিছুটা সময় লাগবে।
সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর কাজের ৭৮ থেকে ৮৭ শতাংশই অর্থনৈতিক হিসাবে আসে না। যেমন– কাপড় ধোয়া, রান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা ইত্যাদি।
এমন অবস্থায় অধিকারকর্মীরা মনে করছেন, প্রকৃতপক্ষে নারীর কাজ বা পুরুষের কাজ বলে কিছু নেই। যে কোনো কাজ, যে কেউ করতে পারে। গৃহস্থালি কাজে টাকার মূল্যায়ন থাকে না; অথচ কাজগুলো অত্যাবশ্যকীয়। পরিবারের এ কাজগুলো একত্রে করা হলে সময় যেমন কম লাগে, তেমনি এ কাজ করলে পরিবারের সদস্যের মধ্যে সহমর্মিতা বাড়ে।

























